রায়হান মুহাম্মদ।।

পাকিস্তানের বিশিষ্ট আলেম ডক্টর আদিল খান রহ.। ৬৩ বছর বয়সে গতকাল (শনিবার) ১০ অক্টোবর করাচীর শাহ ফয়সাল কলোনীতে সন্ত্রসী হামলায় শহীদ হন। ইসলামী বিশ্বে প্রসিদ্ধ আলেম মাওলানা সলিমুল্লাহ খান রহ.-এর বড় ছেলে ছিলেন তিনি। ১৯৭৩ সালে জামিয়া ফারুকিয়া থেকে ফারেগ হন। এরপর করাচী ইউনিভার্সিতে  ইসলামিক কালচারের উপর পিএইচডি করেন। ১৯৮০ তে প্রকাশিত ‘আল ফারুক’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি।

১৯৮৬ থেকে ২০১০ পর্যন্ত জামিয়া ফারুকিয়ার সেক্রেটারি জেনারেলের দ্বয়িত্ব পালন করেন বরেণ্য এই আলেম। এই সময়ে বাবা মাওলানা সলিমুল্লাহ খান রহ.-এর সাথে জামিয়ার শিক্ষা কার্যক্রম ও ভবনের উৎকর্ষ সাধনে কাজ করেন।

এরপর কিছুদিন আমেরিকায় ছিলেন, সেখানে তিনি অনেক বড় ইসলামীক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছেন।

২০১০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের নাম করা ইউনিভার্সিতে প্রফেসরের দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা আদিল খান রহ.।

একজন সফল প্রফেসর হিসেবে ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ার সরকার তাকে নিজ হাতে ‘ফাইভ স্টার র‌্যাঙ্কিং’ (শিক্ষকদের জন্য বিশেষ পুরস্কার) অ্যাওয়ার্ড দেন।

পাকিস্তানের বেফাকুল মাদারিসের কেন্দ্রীয় কমিটির রোকনসহ বিভিন্ন সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন আদিল খান রহ.।

করাচীর জামিয়া ফারুকিয়াতে মাওলানা আদিল খানের কাছে মেশকাত ও মুসলিম শরীফ পড়েছেন জামিয়া ইসলামিয়া তাঁতী বাজারের মুহাদ্দিস ও মাকতাবাতুল আশরাফের স্বত্বাধিকারী মাওলানা হাবিবুর রহমান খান। তিনি বলছিলেন, ডক্টর আদিল খান রহ. মাতৃভাষা উর্দূ ছাড়াও আরবি, ইংলিশ ও পাকিস্তানের প্রত্যেক প্রদেশের ভাষায় সমান পারদর্শী ছিলেন। যখন তিনি পশতু ও অন্য প্রদেশের ভাষাগুলোতে কথা বলতেন, শ্রোতা বুঝতেই পারতেন না তিনি সে অঞ্চলের নন।

একজন আদর্শ শিক্ষক, খতিব, সুসাহিত্যিক হওয়ার পাশাপাশি উলুমুল কুরআন, উলুমুল হাদিস, ইসলামি বিশ্ব, মাকাসেদে শরীয়াহ, ফেকাহ, ইসলাম ও পাকিস্তানের ইতিহাস সম্পর্কে অগাধ পাণ্ডিত্ব ছিল মাওলানা আদিল খান রহ.-এর।

মাওলানা হাবিবুর রহমান খান ইসলাম টাইমসকে বলেন, করাচীর বড় বড় তিনটি মাদরাসার একটি জামিয়া ফারুকিয়া। মাদরাসাটির উন্নয়নের পেছনে ডক্টর আদিল খানের ভূমিকা সব থেকে বেশি। তার হাতে দায়িত্ব আসার পরই মূলত বর্তমানে দৃশ্যমান উন্নয়নগুলো হয়েছে। দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি প্রযুক্তিতে ছাত্রদের স্বাক্ষর রাখতে তিনি ৮০-এর দশক থেকেই ছাত্রদের কম্পিউটার ক্লাস বাধ্যতামূলক করেছিলেন।

করাচীর বাইরে ৭১ একর জমি কিনেছেন মাওলানা আদিল খান রহ.। সেখানে জামিয়া ফারুকিয়ার ২য় শাখা খুলেছেন, এই শাখাটিকে একটি বিশেষ মডেল আরবি বিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা তার বিশেষ ইচ্ছেগুলোর একটি ছিল।

ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্কের বাইরে পারিবারিকভাবেও মাওলানা আদিল খান রহ.-এর সাথে মাওলানা হাবিবুর রহমান খানের ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনেক ভাল ছিল। তার সাথে একাধিক ভ্রমণ ও ব্যক্তিগত স্মৃতি আছে মাওলানা মাওলানা হাবিবুর রহমান খানের।

আরো পড়ুন: পাকিস্তানের মাওলানা আদিল খানের শাহাদাতে দ্বীনী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের শোকবার্তা

একটি ভ্রমণের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একবার ছুটির সময় হুজুরের সাথে সমুদ্র ভ্রমণে যাই। সেখানে গিয়ে আমি পত্রিকা পড়ছিলাম। আদিল খান রহ. তা দেখে আমার আমার কাছ থেকে পত্রিকাটি নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে বললেন, এসফর প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগের, পড়াশোনার জন্য নয়।

পাকিস্তানের প্রথিতযথা আলেম ডক্টর আদিল খান রহ. একাধিকবার বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। বাংলাদেশে সফরে এলেই তিনি বাইতুল মোকাররমের তৎকালীন খতীব মুফতী নুরুদ্দীন রহ.-এর কাছে তার কামরায় থাকতেন। কারো বাড়িতে উঠতে স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন না তিনি। সেখানেই শাগরিদ ও ভক্তবৃন্দরা দেখা করতেন তার সাথে।

বাইতুল মোকাররমে আদিল খান রহ.-এর সাথে সাক্ষাতের আরেকটি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মাওলানা হাবিবুর রহমান খান বলেন, একবার বাংলাদেশ সফরে এসে আদিল খান রহ. আমার পরিবারকে হাদিয়া দেওয়ার জন্য কিছু কাপড় কিনতে বললেন আমাকে, কাপড় কিনতে আমার দেরি হচ্ছিল, তখন আদিল খান রহ. পেছন থেকে আমার পাঞ্জাবির কলার ধরে বললেন- ‘কাপড় কিনতে এতো সময় নষ্ট করছো কেন? তুমি তো বাজার করতে পারো না, এই দেখ বাজার কিভাবে করতে হয়। একথা বলে তিনি আমাকে সাথে নিয়ে পনেরো মিনিটে বাজার শেষ করলেন, এবং বললেন, বাজারে বেশি সময় দিতে নেই।

সাধারণ সব পরিচয়ের পাশাপাশি মাওলানা আদিল খান রহ.একজন আফগান মুজাহিদ ছিলেন বলেও জানা গেছে। তিনি পাকিস্তানে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি ছাত্রদের অনেক ভালোবাসতেন, তাদের সুবিধা, অসুবিধাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

আরো পড়ুন: সন্ত্রাসী হামলায় শহীদ হলেন পাকিস্তানের বিশিষ্ট আলেম ডক্টর আদিল খান

The post শহীদ মাওলানা আদিল খান রহ., জীবন ও স্মৃতি appeared first on ইসলাম টাইমস.

Leave a Reply

%d bloggers like this: