<

p style=”text-align: justify;”>‘আরে আরে… কি করছো? পা ছুঁয়ে প্রণাম করছো কেনো? আর আমি কি তোমার শিক্ষক নাকি যে আমাকে স্যার বলছো? তোমরা হচ্ছো ইয়াং জেনারেশন, প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা তোমরা। তোমাদের স্থান হবে আমাদের মতো ওল্ড জেনারেশনের জন্য – বুকে, পায়ে নয়।’

এদেশে সত্তর দশকে যে কজন শিল্পী নিজস্ব শৈল্পিক গুণ প্রদর্শন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম সফল, সুমহান, স্বতঃস্ফূর্ত, সমকালীন গতিশীল ব্যক্তিত্ব শিল্পী কালিদাস কর্মকার। যিনি একাধারে আত্মানুসন্ধায়ী, দার্শনিক প্রবণ, মননশীল, নিমগ্নতা ও স্বতন্ত্রধারার সাহসী চিত্রশিল্পী। যাকে বলা হয় ‘পাললিক বাংলা শিল্পের রূপকার’। প্রতিথযশা এই গুণী শিল্পী নিরীক্ষাধর্মী কাজের জন্য সমানভাবে বিখ্যাত। আধ্যাত্মিকতা, নান্দনিকতার উপলব্ধিতে যিনি সংকোচ-সংশয়-ভয়ের অনেক উর্ধ্বে। রহস্যময়তা সৃষ্টিতে যার জুরি মেলা ভার। বিমূর্ত চিত্রকলা যার ক্যানভাসে তৈরি হয়েছে দেশীয় আবার কখনো আন্তর্জাতিক রূপরেখায়।

ব্যক্তি কালীদাস কর্মকার বা ‘কালি দা’ হিসেবে যাকে আমরা সবাই এক নামে চিনি, তার সঙ্গে আমার পরিচয় ২০১৬ সাল থেকে। এতো গুণী, এতোটা তারুণ্যের প্রাণোদ্দমে ভরা ব্যক্তি কালি’দা – আমার কাছে তিনিই একমাত্র প্রথম। যাকে খুব কাছ থেকে, কলকাতার রাস্তায়, অলি-গলিতে হাঁটতে হাঁটতে চেনার এবং জানার পরম সৌভাগ্য আমার হয়েছে।

‘শিল্প, শিল্পের উপাদান আমাদের চারপাশে অজস্র,  আমাদেরকে শুধু খুঁজে বের করতে হবে।’ একটি শুকনো পাতা, টাইলস, কাদামাটি, ভাঙা পড়ে থাকা, নষ্ট ফেলে দেয়া জিনিসও যে আর্টের উপকরণ হতে পারে, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের বোধের, জানার, বোঝার, উপভোগের জায়গায় পৌঁছাতে পারে, তা এই মানুষটির সঙ্গে দু’পা না হাঁটলে আমার নতুন করে জানার কিছুটা বাইরে থেকে যেত।

আমরা অনেক বেশি প্রযুক্তি নির্ভর। একাডেমিক জীবনে আমাদের অনেককেই প্রশ্ন বা অভিযোগ করতে দেখা যায়- বর্তমানে শিক্ষার্থীদের অনেকেই ইন্টারনেট বা উইকিপিডিয়া থেকে বের করে তাদের কাজ বা শিল্পকর্ম দাঁড় করায়। কিন্তু আমাদের আসল ক্যামেরা যে আমাদের মাথায় শক্ত অবস্থান নিয়ে বসে আছে, তা আমরা ভুলেই যাই। হাঁটতে-চলতে-বসতে চোখ খোলা রাখা আর প্রয়োজনে ওইসময় নিজের মোবাইলে যা নিতান্তই না পারলে নয়, তা ক্যামেরাবন্দী করা। সবসময় হাতকে মাথা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং কিছু সময় হাতকে ছেড়ে দেয়া। একজন শিশু যখন ছবি আঁকে, তার ছবিতে আমরা পেলবতা খুঁজে পাই, কোথাও গিয়ে একটা শান্তি, মনের আরাম কাজ করে। একজন শিল্পীর ক্ষেত্রেও মাঝে মাঝে নিজেকে আরাম দেয়া উচিত, মনকে অক্সিজেন নেয়ার সুযোগ দেয়া উচিত, যাতে আমাদের মনন-চিন্তন মুক্ত বাতাস নেয়ার সুযোগ পায়।

জীবনের শেষ দিকের অনেকটা সময় মাঝে মাঝে বিদেশে পার করার পরেও নিজের দেশ-মাতৃকার প্রতি তার যে ভালোবাসা, আত্মার বন্ধন তা আমরা তার কাজে, চিন্তায় ও শিল্পকর্মের প্রকাশে বার বার খুঁজে পাই। ‘পাললিক প্রাণ, মাটি ও প্রতীক’ শীর্ষক শিরোনামে তার একক প্রদর্শনী তারই স্বাক্ষ্য বহন করে। মাটিকে রূপ দিয়েছেন অনন্য, ভিন্ন মাত্রায়। সাধারণ আপামর জনসাধারণের প্রবেশ সেখানে অবাধ।

শিল্প বরাবরই ধর্ম, সমাজ, জাতিভেদ তথা যে কোন মতভেদের ঊর্ধ্বে কথা বলে। তিনি সবসময়ই চাইতেন ধর্মের বেড়াজাল ভেঙে, কাদামাটির মননের মানুষেরা, ছোটরা- যারা মাত্র বড় হচ্ছে, বুঝতে শিখছে, তারাও তার প্রদর্শনী দেখুক, কাজ নিয়ে তাদের অজানা জায়গা পরিস্কার হোক, জানুক তারা। এ পৃথিবী সবার, শিল্প চর্চায় সকলের সমান অধিকার। শিল্প চর্চা অন্যায় নয়, মানুষকে ঠকানো অন্যায়, মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়া, মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়া অন্যায়। এমন নজির পাই তার কাজের একক প্রর্দশনীগুলোতে। দুর্নীতি থেকে শুরু করে সামাজিক বিভিন্ন অসামঞ্জস্যকে তিনি তার কাজে তুলে ধরেন – যেখানে সবার মুক্ত অবাধ বিচরণ ছিল। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা যেখানে লাইন ধরে তার প্রদর্শনী উপভোগ করেছেন।

বাংলার সংস্কৃতি, গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য, তাদের কষ্টকে সবার সামনে তুলে আনা তার বরাবরই চাওয়া বা স্বপ্ন। কলকাতার পার্ক স্ট্রীটের মোড় দিয়ে হঠাৎ যাওয়ার সময় তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করে কিছুসময় ভিডিও করলেন। রাস্তার ধারেই এরপর বসে পড়লেন, তারপর বললেন, ‘আরে, থামলে কেনো? বাজাও…. আমি শুনছি। তোমার পারিশ্রমিক তুমি পাবে যা চাও….’

হ্যাঁ, সামনে ছিলো একজন বাঁশিওয়ালা। যে আপন মনে, সুরে-তালে বাঁশি বাজিয়ে বাঁশি বিক্রি করছিলেন। কালিদা বাঁশিওয়ালার ফোন নাম্বার সংগ্রহ করলেন, পরবর্তীতে যোগাযোগ করবেন বলে। কিন্তু সেই কাজটি আজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেলো…….

শিল্পী এবং ব্যক্তি কালি’দা, যার কাজে রং এর ব্যবহারে এবং পরিধেয় বস্ত্রে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে ‘লাল রং’। লাল অপরিসীম, সীমাহীন শক্তির জ্বলজ্বলে প্রতীক হিসেবে কাজ করে শিল্পীর ভাবনা-চিন্তা থেকে শুরু করে, কাজে রং এর ব্যবহারে। এ নিয়ে শান্তিনিকেতনে যে কোন পৌষ মেলায় দাদার কাছে জানতে চেয়েছিলাম এর কারণ কি? উত্তরে তিনি বলেন, ‘ভালোলাগা বা ভালোবাসার যেমন নির্দিষ্ট কোন কারণ হয় না। পথ চলতে চলতে যেমন আমাদের ভালোলাগা বা ভালোবাসা তৈরি হয়, লালের প্রতি আমার ভালোবাসাটাও ঠিক তেমন। তোমাদের মত তরুণ তাজা প্রাণের এক বিশাল এ্যানার্জি যেন এই লাল রং এ আছে। আর আমিও তোমাদের মত তরুণ থাকতে চাই মনে-প্রাণে যতদিন বাঁচি। ’

জীবদ্দশায় শিল্পী কালিদাস কর্মকারের দেশ ও দেশের বাইরে একক চিত্র প্রদর্শনীর সংখ্যা ৭২ টি। চারুকলায় অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি বাংলাদেশের একুশে পদক, শিল্পকলা পদকসহ দেশীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন। শারীরিকভাবে তিনি অনুপস্থিত হলেও তিনি আছেন তার কাজে। এই গুণী শিল্পীর প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকীতে রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক –  শিক্ষার্থী, শিল্প ইতিহাস বিভাগ, রবীন্দ্র ভারতী  বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা।

The post নিরীক্ষাধর্মীতা ও পাললিক বাংলা শিল্পের রূপকার কালিদাস কর্মকার appeared first on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

Leave a Reply

%d bloggers like this: